ঘুরে এলাম কক্সবাজার জেলার দর্শনীয় স্থান গুলি ।ঘুরতে যাবার আগেই জেনে নিন বিস্তারিত তথ্য

আমি ফারজান লুসি এবং পেশায় একজন শিক্ষিকা । আমার বিয়ে হয় ২০১১ সালে ৪ সেপ্টেম্বর । বিয়ের পর ঐ বছর হানিমুনে কক্সবাজার জেলার দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে বেড়াতে যাওয়ার জন্য আমার স্বামী বলে । স্বামীর কথা অনুযায়ী কক্সবাজারে হানিমুনে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হলো ।

ঘুরতে বেড়াতে যাওয়ার পূর্বেই সনির একটা ক্যামেরা কিনে আনলাম ।এরপর সব কিছু গুছিয়ে নিলাম । রাতে খেয়ে বের হলাম দুজনে রাত ৯ টায় কল্যানপুর থেকে সিএনজিতে গেলাম পান্থ পথে ।ভলবো এর টিকেট কাটা হয়েছিল । ভলবোর সার্পোট বাসে করে সব যাত্রীদের নিয়ে গেল শান্তিবাগ(মনে হয় রাত) ১১ টায় শান্তিবাগের ভলবোর মেইন কাউন্টার থেকে গ্রীন লাইন এসি বাস ছাড়ল ।

বাস কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে সেই যে রওনা হলো – পথ যেন ফুরায় না । কুমিল্লায় হোটেলে বাস থামল । খাওয়া-দাওয়া করলাম ।বাস আবার ছাড়ল । চট্টগ্রাম পৌছাতে পৌছাতে ভোর হয়ে গেল । এসি বাসে প্রায় সব মহিলা ও বাচ্চা-কাচ্চা বমি শুরু করে দিল । আমার বমি তো থামেই না আমার স্বামী বারবার বলে এইতো আর একটু –আর একটু । এভাবেই কক্সবাজার অবশেষে পৌছালাম ।বাস থেকে নামার পর কিযে ভাল লাগল । রিক্সায় করে বুকিং দেওয়া হোটেলে পৌছালাম ।

আমরা ঢাকা থেকে কল্যানপুরের ভলভো টিকিট কাটি এবং ভলভো বাস কাউন্টার ম্যানেজারের মাধ্যমেই হোটেল বুকিং দেই । হোটেলটির নাম ছিল হোটেল সি ওয়াল্ড (HotelSeaWorld.com) । এটি হোটেল মোটেল জোন কক্সবাজার এলাকায়, একেবারে সিবিচের সন্নিকটে অবস্থিত । হোটেল রুমের ভাড়া ছিল নন এসি রেগুলার কাপল বেড ১৬০০ টাকা । দুই দিন ভাড়া নিয়েছিল ৩২০০ টাকা ভ্যাটসহ ।একটা জিনিস খুব ভাল লেগেছিল হোটেল কাউন্টার এ বসা মাত্র ওরা আমাদের দুজনকেই ওয়েলকাম ড্রিংস দিল যা খুব ভাল লাগল । আর ঐ হোটেল এর সিস্টেম হলো পরের দিন সকাল থেকে প্রতিদিন থাকলে প্রত্যহ সকালে নাস্তা ফ্রি । খুবই উন্নতমানের ভাল নাস্তা ছিল । যতই খাই কোন সমস্যা নেই । চা ছিল খুবই সুস্বাদু ।

 হোটেলের কাউন্টারে সব প্রসিডিউর সমাপ্ত করার পর পৌছে গেলাম-৩২০ রুমে । রুমে পৌছালাম সকাল ১০ না ১১ টায় যেন । পৌছেই আর দেরী সহ্য হচ্ছিল না । গোসল করে ফ্রেস হওয়ায় গত রাতের বাস জার্নির সব কষ্ট ভুলে গেলাম ।

১ম দিন সিবিচ পরিদর্শন/সমুদ্র দেখা

এবং তখনাই সমুদ্র দেখার জন্য চলে গেলাম লাবনী সি বিচে যেটা সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত ও বড় এলাকা নিয়ে ।হোটেল থেকে বের হয়েই কিছু দুর যেতেই ছিল বার্মিজ মার্কেট এর শুরু । বার্মিজ মার্কেট এক বিশাল সামগ্রীর মার্কেট যা বার্মা থেকে আনা হত । এখানে বেশি বেশি দেখলাম বিভিন্ন ধরনের আচার, বিভিন্ন ধরনের টুপি (Cap) যা ছিল বিভিন্ন আকার ও রঙের । সিবিচে নামার আগে সিবিচে নামার আগে বার্মিজ মার্কেট থেকে দুজনে ২ টা ক্যাপ নিলাম প্রচন্ড রোদ থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য। ছবিও তুললাম তখন দেখি কিছু ছেলে আছে ক্যামেরা নিয়ে এরা ছবিতুলে দেয় । ছবি প্রতি এরা নেয় ২০ টাকা । সন্ধ্যায় স্টুডিও থেকে ছবি গুলি ডেলিভারি করে ঐ ছেলেদের মাধ্যমেই । এরপর আস্তে আস্তে সিবিচে গেলাম । গেয়েই নেমে পড়লাম সমুদ্রের পানিতে হাটু পর্যন্ত । দুজনেই দুজনের ছবি তুললাম । এরপরি এক ছেলে এল ছবি তুলে দিতে দুজনের একসাথে । বলল, আমার ডিজিটাল ক্যামেরায় আপনাদের কয়েকটি ছবি তুলে দিই দুজন একসাথে রাজি হলাম । তবে বললাম হোটেলে তাহলে মোবাইল আর ক্যামেরা রেখে আসি । ফিরে এলাম হোটেলে ক্যামেরা, মোবাইল রেখে আবার আসলাম নিচে এবার দুপুর হয়ে গেল । তাই সিবিচের কাছেই একটি হোটেলে খেয়ে নিলাম । খেয়ে ছিলাম- রুপচাঁদা মাছ, শুটকি মাছ, লাল চালের ভাত এগুলি খুবই সুস্বাদু ছিল । এখনও মনে হয় মুখে লেগে আছে ।এরপর বিকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত  সমুদ্রের পানিতে নামলাম, ভিজলাম, ছবি তুলল ছেলেটি । অনেক ভাল ছবির মধ্যে ১ টি ছবি খুব লাগল । প্রায় সময় এই ছবিটি দেখি আমরা দুজন আর চলে যাই সেই স্মৃতিতে ।

Cox Bazar Tour-Kolatoli Beach-CoxBazar

২য় দিন সেন্টমার্টিন ভ্রমন :

এরপরের ‍দিন ১৬ ডিসেম্বর ২০১১ খুব ভোর প্রায় ৫.৩০টায় ফোন দিল সেন্টমার্টিন যাবার ট্যুর গাইড ।যা আমি আগের দিনেই বুকিং করে রেখেছিলাম । আমাদের দুজনের সেন্টমার্টিন ট্যুর প্যাকেজ ছিল ৩০০০ টাকা এবং অগ্রিম দিয়ে ছিলাম মনে হয় ১০০০টাকা ।খুব ভোরেই আমরা ঘুম থেকে উঠেছিলাম । গোছল সারলাম । এবং শীতের কাপড় চোপড় পরে নিচে আসলাম । নেমে দেখলাম ট্যুর গাইড ।বাসে আরও ট্যুরিস্ট নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল । আমরা দুজন বাসে উঠা মাত্রই রওনা হলাম সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে অথাৎ কক্সবাজার শহর থেকে উত্তর দিকে টেকনাফে পৌছালাম সকাল ৯ টায় এবং সেখান থেকে জাহাজে করে আমরা আবার রওনা দিলাম এবার সেন্টমার্টিনে এর উদ্দেশ্যে । প্রায় সব জাহাজই ছাড়ল ঠিক ৯ টায় এবং ৩ ঘন্টা পর পৌছালাম ১২ টায় । ট্যুর অপারেটর জানাল সেন্টমার্টিন ঘুরে ঠিক ৩ টায় ফিরে আসার জন্য নতুবা ঐদিন আর জাহাজে ফিরতে পারবনা । প্রতিদিন ৩ টায় জাহাজগুলি টেকনাফ তথা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয় ।নাফ নদীতে জাহাজ চলার সময় নিচতলা, দোতলা ও ছাদে অনেক ঘোরা ঘুরি করলাম এবং জাহাজ থেকে নাফ নদীর দুপাশে ও নাফ নদী দেখলাম ।

ট্যুর অপারেটর আমাদেরকে জাহাজ থেকে নামিয়ে সেন্টমার্টিনে ১ টা হোটেলে খাওয়ালো যা ছিল ট্যুর প্যাকেজের অংশ । এরপর ১ টা ছেলেকে নিলাম আমাদের ঘুরাবার জন্য । এরপর আমরা ভ্যান গাড়িতে করে চলে গেলাম সমুদ্রের তীরে । সেন্টমার্টিনে হাটু সমান পানিতে নেমে আনন্দ করলাম । ছবি তুললাম সেন্টমার্টিনের এবং যে জায়গায় আমরা তীরে আসলাম সেখান থেকে পশ্চিম দিকে ঘিরে যেতে আবার চলে এলাম ২.৩০টায় ভ্যান গাড়িতে করে জাহাজে উঠার জন্য । জাহাজে উঠা এবং নামার জন্য একটি ব্রীজ আছে যা পানি পার করে দেয় ।ফিরে আসার সময় অবশ্য অনেক শুটকি কিনেছিলাম । শুটকির ব্যাগ নিয়ে জাহাজে ফিরলাম ঠিক ৩ টায় জাহাজ ছাড়ল । সন্ধ্যা ৬ টায় ফিরলাম শাহ পরীর দ্বীপে এবং সেখান থেকে মাইক্রোতে করে ট্যুর অপারেটর আমাদেরকে নিয়ে আসলো আমাদের হোটেলে রাত ৯ টায় । হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে আবার চলে এলাম লাবনী সিবিচে ১ টা পর্যন্ত সময় কাটিয়ে হোটেল থেকে রাতের খাবার খেয়ে এসে হোটেল রুমে শুয়ে পড়লাম ।

Cox Babzr Tour-Himchori

৩য় দিন হিমছড়ি ও ইনানী বিচ দর্শন :

এর পরের দিন অথাৎ ১৭ ডিসেসম্বর ঠিক করলাম হিমছড়ি দেখতে যাব । কলাতলি থেকে হিমছড়ি দক্ষিন দিকে প্রায় ২০ কিমি; দুরে । ১ টি সিএনজি নিয়ে রওনা দিলাম সকাল ৮ টায় হিমছড়ির দিকে । হিমছড়িতে এসে ঝরর্না দেখলাম । সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম সেখানে থেকে সমুদ্র তীর দেখা যায় । পশ্চিম দিকে আর পূর্ব দিকে বন আর বন, গাছ গাছালি ভরা ।ঐ সিএনজি যেটা ঠিক করে ছিলাম হোটেলের সামনে থেকে যে হিমছড়ি ও ইনানীবিচ দেখিয়ে আবার হোটেলে ফিরে আসা পর্যন্ত বুকিং মনে হয় ৫০০ টাকা নিয়েছিল । এবার হিমছড়ি থেকে রওনা দিলাম ইনানী বিচে । ইনানী বিচে পৌছে ডাব খেলাম ।ইনানী বিচ লাবনী বিচ এর মতই সিবিচে ছোট ছোট গাড়ি আছে যেগুলিতে ২০০ টাকায় চড়ার ১৫/২০ ‍মিনিট নিয়ে ‍ঘুরে । আমরা অবশ্য সময় কম ছিল তাই উঠিনি । ঘোরাঘুরি করে সিএনজিতেই আবার হোটেলে ফিরে আসলাম ১২ টায় এবং রুমে উঠে লাগেজ নিয়ে রওনা দিলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে । চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি ভ্রমন করার জন্য । অন্য আরেক দিন চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির ভ্রমন নিয়ে লিখব ইনশাআল্লাহ । শেষ হল ১৪ ডিসেম্বর রাত থেকে ১৭ ডিসেম্বর দুপর পর্যন্ত কক্সবাজার ট্যুর ।

Cox Bazar Tour-Saint Martin

 

The following two tabs change content below.
ফারজানা লুসি

ফারজানা লুসি

আমি একজন গৃহিনী। আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় ও বিখ্যাত জায়গাগুলি ঘুরে বেড়াতে খুব আনন্দ পাই । আর ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা ওয়েবসাইটে লেখার মাধ্যমে আপনাদের জানানোই আমার ভালোলাগে ।
Default image
ফারজানা লুসি
আমি একজন গৃহিনী। আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় ও বিখ্যাত জায়গাগুলি ঘুরে বেড়াতে খুব আনন্দ পাই । আর ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা ওয়েবসাইটে লেখার মাধ্যমে আপনাদের জানানোই আমার ভালোলাগে ।
Articles: 2
error: Content is protected !!